তাহলে শেষ কোথায় ? -জনগণ ও রাজনীতির বাংলাদেশি পরিহাস !

 তাহলে শেষ কোথায় ?

-জনগণ ও রাজনীতির বাংলাদেশি পরিহাস

বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে এক সময় রাজনীতি মানে ছিল স্বপ্ন, সংগ্রাম, এবং সাহসের গল্প। এ দেশের জন্মই হয়েছিল এক অসামান্য রাজনৈতিক চেতনার জাগরণ থেকে—ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার দাবি, গণ-আন্দোলন, এবং সর্বশেষ স্বাধীনতার যুদ্ধ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে: এত পথ পেরিয়ে এসে আজ আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?


তাহলে শেষ কোথায়?

আজ রাজনীতি যেন এক অভিশাপের নাম, যেন এক দূষিত শব্দ। তরুণরা বলে “রাজনীতি মানেই নোংরা খেলা”, বুদ্ধিজীবীরা বলেন-“রাজনীতি এখন পেশাদার দুর্নীতিবাজদের হাতে”, আর সাধারণ মানুষ কেবল ভোট দেয় কিন্তু শাসিত হয় তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে। এই যে রাজনীতি থেকে মানুষের বিচ্ছিন্নতা, এটাই সবচেয়ে বড় পরাজয়।

জনগণ কি এখনো রাজনীতির মালিক ?

সংবিধানে লেখা আছে “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ” কিন্তু সেই জনগণ আজ কোথায়? গুম, খুন, গলাকাটা মামলা আর পেটোয়ার লাঠির ভয়ে মানুষ রাজনীতি থেকে দূরে। শহরের রিকশাওয়ালা হোক বা গ্রাম্য কৃষক, রাজনীতি তাদের জীবনে দামি চাল, পানি সংকট আর ঘুষ ছাড়া আর কিছু দেয়নি।

একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ছিল মত প্রকাশের কেন্দ্র, আজ সেখানে 'ছাত্ররাজনীতি' মানে অস্ত্র, দখল আর নিয়ন্ত্রিত 'লিডার'। রাজনীতির প্রাণ ছিল পাড়া-মহল্লার চায়ের আড্ডায়, আজ সেখানেও শুধু হতাশা। মানুষের মধ্যকার রাজনৈতিক সংলাপ আজ নিষ্ক্রিয়, নিঃশব্দ।

নেতৃত্বের চিরাচরিত দস্যুবৃত্তি

রাজনীতি আজ পরিবারতন্ত্র আর কর্পোরেট স্বার্থের দাস। নেতা হওয়ার জন্য ত্যাগ নয়, দরকার টাকা, সংযোগ ও দলে অনুগত থাকা। এই ব্যবস্থায় মেধাবী, নীতিবান, তরুণদের স্থান কোথায়?

আমাদের দেশে নেতৃত্বের উৎপত্তি জনগণের মধ্য থেকে নয়, বরং ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতায়। ‘নেতা’ মানেই এখন ল্যান্ড ডিলিং, ঠিকাদারি, তেলবাজি আর প্রতিপক্ষ দমনে পটু হওয়া। এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে নৈতিকতা নয়, সুযোগ আর চাটুকারিতা হচ্ছে মূল যোগ্যতা।

প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচন: নাম আছে, প্রাণ নেই

নির্বাচন কমিশন আছে, কিন্তু নিরপেক্ষতা নেই। আদালত আছে, কিন্তু বিচার নিয়ে প্রশ্ন আছে। গণমাধ্যম আছে, কিন্তু মুখ বন্ধ। সংবিধান আছে, কিন্তু কার্যত কাগজে।বিভিন্ন সময়ে জাতীয় নির্বাচন একতরফা কিংবা অংশগ্রহণহীন হয়েছে। জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন না থাকলে, সেটি আর গণতন্ত্র থাকে না, থাকে কেবল একদলীয় শাসনের আধুনিক রূপ। আবার ইদানিং কোন কোন দল নির্বাচন পেছানোর পক্ষে, আবার কেহ দাবি করছে কেহ কেহ নির্বাচনই চায়না। 

বিকল্প কোথায়?

বাংলাদেশে বর্তমানে মূলধারার বাইরে একটি বিকল্প রাজনৈতিক কাঠামো দাঁড় করানো কঠিন, কারণ জনগণ শুধু হালুয়া-রুটির রাজনীতিকেই চিনেছে। কিন্তু সামাজিক আন্দোলন, পরিবেশবাদী সংগ্রাম, শ্রমজীবীদের অধিকার দাবি, নারী ও লিঙ্গ বৈচিত্র্য আন্দোলন, এসবই তো এক ধরনের নতুন রাজনীতি। জনগণ যদি এখানেই আশা খোঁজে, তবে রাজনীতির পুনর্জন্ম এখান থেকেই সম্ভব।

তাহলে শেষ কোথায়?

শেষ নেই, কারণ জনগণ কখনোই পরাজিত হয় না। কিন্তু এই অন্ধকার রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে আমাদের জিজ্ঞাসা করা জরুরি:

  • আমরা কি কেবল 'ভোটার' হয়ে বেঁচে থাকবো, নাকি নাগরিক হয়ে উঠবো?

  • রাজনীতি কি কেবল তাদের জন্য যারা পেশাদার প্রতারক, না কি এই ক্ষেত্রও আমরা ফিরিয়ে নিতে পারি?

যদি উত্তর হয়: “হ্যাঁ, আমরা ফিরিয়ে নিতে চাই” তাহলে শুরু হোক নতুন রাজনীতি।
এখানে শেষ নয়, এটাই হোক শুরু।

শেষ নয়, বরং প্রশ্নের শুরু এখানেই—তাহলে শেষ কোথায়?
আপনি, আমি, আমরাই তো সেই জবাব।


লেখক-

Peoples Political Agency Writer Forum 

Comments

Popular posts from this blog

জনগণ ও জনমন: বাংলাদেশের রাজনীতির অপ্রকাশিত দূরত্ব-The People and the Public Mind

বাংলাদেশ মানে কি কেবলই দলে দলে ভাগ হওয়া ?

চেতনার আগ্রাসন গণতন্ত্রের শিকড়ে আঘাত